সৈয়দ মুজতবা আলী : আলোকিত জীবন

১৯০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলার অন্তর্গত (বর্তমানে ভারতের আসামে) করিমগঞ্জ শহরে সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, চঞ্চল ও পড়ুয়া। ১৯১৯ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট সফরে এলে সৈয়দ মুজতবা আলী কবির বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেন এবং তার ভক্ত হয়ে যান। সৈয়দ মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে পড়ালেখায় আগ্রহী ছিলেন এবং এ জন্য তিনি ১৯২১ সালে বিশ্বভারতীতে ভর্তি হন। শান্তিনিকেতনে পাঁচ বছর অধ্যয়নের পর ১৯২৬ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ওই বছরই তিনি বাংলায় লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। আলীগড়ে আইএ অধ্যয়নকালে তিনি আফগানিস্তানের শিক্ষা বিভাগে চাকরি নিয়ে কাবুল গমন করেন। অত:পর ১৯২৯ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য জার্মানিতে গমন করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৪-৪৫ সালে সৈয়দ মুজতবা আলী আনন্দবাজার পত্রিকায় কিছু দিন সাংবাদিকতা করেছেন এবং দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। ১৯৪৮ সালে সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আলোচনা সভায় পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি উর্দু ভাষার সপক্ষ শক্তির হাতে নাজেহাল হয়েছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে যান এবং কিছু দিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মালানা আবুল কালাম আজাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইন্ডিয়ান ‘কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স’-এর সচিব পদে নিযুক্ত হন। অত:পর তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-এর স্টেশন ডাইরেক্টর পদে কিছু দিন চাকরি করেন এবং সেই চাকরিতেও ইস্তফা দেন ১৯৫৬ সালে। অত:পর তিনি বিশ্বভারতীতে কয়েক বছর অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। (ড. মাহফুজুর রহমান, নানা প্রসঙ্গ নানা ভাবনা, পৃ. ১৮-২৯)।
সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। জীবন নামক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, সেগুলোকেই তিনি সাহিত্যে রূপদান করেন। একাধারে তিনি ভ্রমণ-সাহিত্য রচয়িতা, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রবন্ধকার। তার ভ্রমণ-সাহিত্য হিসেবে ‘দেশে বিদেশে’, ‘জলে-ডাঙায়’, ‘ভবঘুরে’, ‘মুসাফির’, ‘বিদেশ’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার রচিত উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘অবিশ্বাস্য’, ‘শবনম’, ‘শহর-ইয়ার’ ও ‘তুলনাহীনা’। বিচিত্র রসের নানান গল্প তিনি লিখেছেন। কখনো হাস্যরসের গল্প, কখনো করুণ রসের গল্প, কখনো মধুর রসের মিষ্টি প্রেমের গল্প, আবার কখনো বা ভয়ঙ্কর রসের গল্প তিনি লিখেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন লঘু নিবন্ধকার তথা রম্যপ্রবন্ধ রচনায় ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তিনি ভ্রমণ-সাহিত্য রচয়িতা এবং রম্যরসিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
সৈয়দ মুজতবা আলী প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক নূরুর রহমান খান তার ‘মুজতবা-সাহিত্যের রূপবৈচিত্র্য ও রচনাশৈলী’ গ্রন্থে বলেছেন ‘হালকা মেজাজে আড্ডার ঢঙে বলে গেলেও মুজতবা-বচন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, শাস্ত্র চর্চা ও সার্থক বিচার-সমালোচনায় পরিপূর্ণ। তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন, বারংবার কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তন হয়েছে, বহুজনের সান্নিধ্য লাভ করেছেন পণ্ডিত, গুণী, রাজনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এবং এই সাধারণের প্রতি তার সহানুভূতি সমধিক। এর প্রতিফলন ঘটেছে মুজতবা আলীর প্রতিটি রচনায়। যে অসংখ্য ছোট ছোট রচনা তার খ্যাতির উৎস, সেগুলো ‘রম্যরচনা’ অভিধায় চিহ্নিত। কারণ, এগুলো পাঠকদের চিত্ত-বিনোদন ও অনাবিল আনন্দদানে সমর্থ সফল সৃষ্টি। বর্ণনভঙ্গির গুণে পাঠক অনেক সময় হাসির আবেগ সংবরণ করতে পারেন না বটে, কিন্তু আলী সাহেব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিবিধ ভাষা ও শাস্ত্র থেকে আহৃত মনীষার ফসল এই শ্রেণীর রচনার মাধ্যমে পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। তাই এগুলো নিছক রম্যরচনা নয়, সাবলীল ভাষায় প্রকাশিত মনোহর প্রবন্ধও বটে।’ (পূর্বকথা)।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক রম্যরচয়িতা কিংবা লঘু নিবন্ধকার হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) নাম উল্লেখ করা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘লোকরহস্য’, ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’ ইত্যাদিতে রম্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রমথ চৌধুরীর (১৮৬৮-১৯৪৬) প্রবন্ধেও বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়। সৈয়দ মুজতবা আলী তার নানা লঘু নিবন্ধে রম্যরস ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন, তার রচিত ‘হিডজিভাই পি মরিস’ লেখাটির কথাই বলা যাক। ‘সেন্টিমেন্টাল এবং আদর্শবাদী’ অধ্যাপক মরিস ফরাসি পড়াতেন। তার ক্লাসে প্রবীণ অধ্যাপকগণও উপস্খিত থাকতেন। একদিন “ফরাসি ব্যাকরণের কী একটা কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলেছেন অধ্যক্ষ বিধুশেখর। মরিস সাহেব বললেন, ‘চমৎকার। শাসট্টি মশায়। সট্যি, আপনি একটা অস্টো ঘুঘু।’
শাস্ত্রী মশাইয়ের তো চক্ষুস্খির। …শুধালেন, ‘মরিস, এটা তোমাকে শেখালে কে?’
নিরীহ মরিস… বললেন, ডিনডা (দিনদা, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)। উনি বলেছেন ওটার অর্ট ‘অসাডারণ বুডডিমান’। টবে কি ওটা ভুল।” অধ্যাপক মরিসের বাংলা ভাষা জ্ঞান এবং অভিনব বাংলা উচ্চারণ সত্যি হাসির খোরাক জোগায়।
সৈয়দ মুজতবা আলীর এমন আরেকটি লেখা ‘অনুকরণ না হনুকরণ?’ ‘অক্ষম অনুকারী ও পেশাদার সমালোচকদের’ প্রসঙ্গে তিনি এ প্রবন্ধে ব্যঙ্গ করেছেন। বিষয়বস্তু ও ভাষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে অন্যকে যে যথাযথভাবে অনুকরণও করা যায় না তা তিনি এ প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তথাকথিত সমালোচকদের ব্যঙ্গ করেই প্রবন্ধটি রচিত। তথাকথিত সমালোচকরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সাহিত্যের সমালোচনা করেন। ফলে কমজোর লেখকও বড় লেখক হয়ে যান। এ শ্রেণীর সমালোচকরা সাধারণত ‘সর্বকর্মে নামঞ্জুর হয়ে’ অর্থ উপার্জনের প্রয়োজনে সমালোচকের ভূমিকা পালন করেন। একটি প্রচলিত চুটকির মাধ্যমে সৈয়দ মুজতবা আলী এ জাতীয় সমালোচকদের ব্যঙ্গ করেছেন। চুটকিটি হচ্ছে এক পাগল নিজেকে মহারানী ভিক্টোরিয়ার স্বামী ভাবতেন। “পাগলা সেরে গেছে এই রিপোর্ট পাওয়ার পর পাগলা-গারদের বড় ডাক্তার তাকে ডেকে পাঠিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে শুধালেন, ‘তা তুমি খালাস হওয়ার পর করবে কী?’ সুস্খ লোকের মতো বললেন, ‘মামার বড় ব্যবসা আছে, সেখানে ঢুকে যাব।’ ‘সেটা যদি না হয়?’ চিন্তা করে বললেন, ‘তা হলে আমার বিএ ডিগ্রি তো রয়েছেই, টিউশনি নেব।’ তারপর এক গাল হেসে বললেন, ‘এত ভাবছেন কেন, ডাক্তার? কিছু না হলে যেকোনো সময়ই তো আবার মহারানীর স্বামী হয়ে যেতে পারব।” এই চুটকির মাধ্যমে সৈয়দ মুজতবা আলী বুঝিয়েছেন, পাগল হওয়ার মতো তথাকথিত সমালোচকও সব সময় হওয়া যায়।
‘ইঙ্গ-ভারতীয় কথোপকথন’ প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলীর ব্রিটিশ-বৈরিতা প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজদের যাবতীয় আচার-আচরণ অনুকরণ করা যে ভারতীয়দের জন্য স্বাস্খ্যপ্রদ নয় তা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তৎকালীন ভারতে পর্দা প্রথা সম্পর্কে ইংরেজ সাহেবের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন লেখক চমৎকার রসিকতার মাধ্যমে। লেখকের ভাষায় “১৭৫৭ সালে তোমাদের সাথে পিরিতি সায়রে সিনান করিতে গিয়া শুধু যে আমাদের সকলি গরল ভেল তাহা নয় স্বরাজ গামচাখানা হারাইয়া ফেলিয়া দুইশত শীত বৎসর ধরিয়া আকণ্ঠ দৈন্যদুর্দশা পঙ্কে নিমগ্ন ডাঙ্গায় উঠিবার উপায় নাই। পুরুষদের তো এই অবস্খা, তাই মেয়েরা অন্দরমহলে তোমাদের ক্ষৎময় করিয়া বসিয়া আছেন।” সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় এভাবেই দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। দেশ-বিদেশের নানান গল্পকথা ব্যবহার করে লেখক তার বক্তব্যকে শাণিত করেছেন। তিনি একটি ইরানি উপকথা নিয়ে লিখেছিলেন ‘বিষের বিষ’ গল্পটি। গল্পটির সারাংশ হচ্ছে এক দজ্জাল স্ত্রীকে শাস্তি দেয়ার জন্য একটি গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই গর্তের কাল-নাগিনী পর্যন্ত সেই দজ্জাল মহিলাকে দংশন করেনি নিজের প্রাণের মায়ার কারণে। গল্পের এই সারাংশটি লেখক ব্যবহার করেছেন ভিন্ন প্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের নিবন্ধে। সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন
“কাগজে পড়লুম কোন এক প্রদেশে মন্ত্রীদের জ্যান্ত সাপের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনা করা হয়েছিল। সাপগুলো যে কেন ওদের ছোবল মারেনি, আজ ইরানি গল্পের স্মরণে কথাটা ফর্সা হয়ে গেল।
এবং বুঝতে পারলুম, ইরানি গল্পটা গল্প নয়, সত্য ঘটনা।”
মূলত সৈয়দ মুজতবা আলীর অসংখ্য লেখায় রম্যরস ছড়িয়ে আছে। রম্যরচনার পোশাকে তিনি স্বদেশ, সমাজ, মাতৃভাষা, শিক্ষা, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার মতো প্রতিভাবান লেখক বাংলা সাহিত্যে বিরল। তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

Leave a Reply

Close Menu