একটি চিঠির খোঁজে!

চতুর্দিকের দৃষ্যপট ক্রমশ ঘোলা হয়ে আসছে,

সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালাবার সময় হয়ে এলো বুঝি,

কোথায়ে ডাক পিয়ন, কোথায়ে চিঠি?

পথের ধুলো উড়িয়ে ফিরে আসছে একদল ছেলে পুলে,

কর্ম ব্যাস্ত দিনের শেষে ফিরে আসছে কর্মজীবী মানুষ,

তবুও ডাক পিয়নটার কোন দেখা নেই!

ও কি ছুটি নিয়েছে, যদি তা না হয় তবে কেন আসছে না,

কেন ভাঙ্গছে না মৌনতার দেয়াল,

হাপিত্যেশ করে কাটছে না সময়,

পাখিদের কোলাহলে আমার ধ্যান ভাঙ্গে,

ওরাও ফিরে যাচ্ছে নীড়ে,

তবে কি আজও আসবে না তোমার চিঠি?

 

সেই কবে উত্তর দিয়েছিলে এনেছিলে সপ্নে বিভোর দিন,

তারপর কেটে গেছে কত বিনিদ্র রাত,

গাঢ় অন্ধকারে আমি কত দূর ছুটে গেছি রাতের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে,

তুমি বলেছিলে আমি নিষ্ঠুর-আমি তোমাকে ছাড়া চাঁদের আলোয় জ্যোৎস্না স্নান করি,

তাই আমি চাঁদ দেখাই ছেড়ে দিয়েছি,

অশ্বথ গাছের চুরায় যখন নিসঙ্গ প্যাঁচা ডেকে উঠে,

তখন বুকের পাঁজর ছিঁড়ে বের হয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে শিস দিয়ে দূরে হারিয়ে যায়,

রাত চলে যায় আসে নতুন দিন,

নতুন প্রতিক্ষা, তোমার চিঠি হয়ত আজ আসবে!

 

এই তো সেদিনের কথা,

কাঠফাটা রোদে রাস্তার পিচ গলে গলে যাচ্ছিল,

তার মাঝেই আমি ছুটে গেছি পোস্ট অফিসে,

চিঠির খোঁজে,

পোস্ট মাস্টার খুব বিরক্ত হোল,

চিঠি আসে নি,

ভারি হয়ে আসলো আমার নিঃশ্বাস,

জীবনের স্বাদ তিতা হয়ে আসছে,

কত কিছুই না তোমাকে বলার আছে,

ঐ যে পুকুরের ধারে তুমি একটা গোলাপের গাছ লাগিয়েছিলে,

সেই গাছে ফুল ফুটেছে,

সেই ফুলের পাপড়িই তো নীল খামে করে পাঠিয়েছিলাম,

মনে আছে সেই দৈত্য দেহি বট গাছটির কথা?

যার আড়ালে আমরা পড়ন্ত বিকেলের ঘ্রান নিতাম,

সেই গাছ টিও মরে গেছে,

সে দিন আমি অনেক কেঁদেছিলাম,

তুমি জান না,

কত কথাই না জমা হয়ে আছে,

সে দিন নদীর পার ধরে হাঁটছিলাম,

নদীর জলে নিজের ছায়া দেখে তোমার সেকি ভয়!

মনে পরে?

স্মৃতিতে মাতাল হয়ে হাঁটছিলাম সেদিন বাজারের পথ ধরে,

একটু হলেই গাড়ির নিচে পরছিলাম,

অন্ধ বলে গর্জন করে উঠলো গাড়ির চালক!

আমি রাগ করলাম না,

ভাবলাম এখানে তুমি থাকলে কতই না রাগ করতে!

আমি অনেক বদলে গেছি,

স্থবির হয়ে গেছে আমার জীবন,

তুমি আমাকে দেখলে বিপন্ন বিস্ময়ে ফেটে পড়তে!

 

কত কথাই না জমা হয়ে আছে!

তোমার উদ্দাম ভালোবাসার দ্যুতিতে আমি উজ্জ্বল হয়েছিলাম,

মনে পরে সেই দিনের কথা- যে দিন তুমি চলে গিয়েছিলে নীল খামে একটি চিঠি আমার হাতে দিয়ে,

সে দিন পুরো শহরটা কে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লেগেছিল!

ভেজা মেঘের ভেলায় করে উড়ে যেতে ইচ্ছে করেছিল দূরে কোথাও,

সব সুখের জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু তোমাকেই চেয়েছিলাম!

তুমি তাকিয়ে ছিলে ভেজা চোখ নিয়ে,

নির্বাক, অবিশ্বাসী মন নিয়ে,

আমি তোমাকে আটকাতে পারি নি,

তুমি চলে গেলে রয়ে গেলো একটি নীল খামে ভরা ভালোবাসা,

তুমি লিখেছিলে পৌঁছেই তুমি আমায় চিঠি লিখবে!

কই কত দিন হোল তুমি গিয়েছ,

আজও কি তোমার পথ শেষ হয়নি?

না কি মিলেনি চিঠি লেখার ফুরসত!

লোক মুখে শুনি তুমি নাকি এখন অন্য কারো ঘরণী!

আমি আপন মনে হাসি!

তাই কি হয়!

তুমি লিখেছিলে তুমি থাকবে আমার হয়ে,

তোমার চিঠিতে , তোমার ভালোবাসায়,

সব সপ্নের রঙ ধূসর হতে পারে কিন্তু এই চিঠি!

এটা শুধুই আমার,

না আমাদের!

আমি চিঠি লিখি- প্রতিটা ক্ষণে – মনের আনাচে কানাচে,

চিঠি লিখি সন্তর্পণে,

চিঠি লিখি তোমার তরে,

নীল খামে করে পাঠাই সে চিঠি অজানার উদ্দেশে,

সে চিঠিতে লুকিয়ে থাকে কত অভিমান, ভালোবাসা!

তুমি কি তা জান না,

তবুও চিঠির উত্তর কেন আজও মেলে না,

একদিন ডাকপিয়ন আসবে আমার দুয়ারে,

নীল খাম খুলে দেখব তোমার চিঠি,

সে আমার সমাধি পাবে পূর্ণতা,

চিঠির আড়ালে লুকাবে আমার অতৃপ্ত আত্মা!

Leave a Reply

Close Menu